Thursday, November 8, 2018

রবীন বসু

অন্যতর জলযাত্রা

মধ্যরাতে আড়ি পাতে কারা? কারা শব্দহীন মাঠ প্রান্তর
পেরিয়ে ভাঙা কালভার্টের পাশে জড়ো হয়?

কবন্ধছায়া আর ওই অক্ষরমালা কবির জানালার পাশে
হাঁটুমুড়ে বসে কী শোনে?

পাঁজরভাঙা কবি মৃত্যুর আগে  অস্ফুটে যে উচ্চারণ রেখেছিল তা কী যন্ত্রণাময় অতীত...

গভীর কোন আপাত সান্ত্বনা খোঁজে? আশ্রয়প্রার্থিত অন্ধকার বিলম্বিত ভ্রমণের শেষে নক্ষত্রখচিত অলক্ষণ

অবশেষে কালভার্টের পাশে জড়ো হওয়া ষড়যন্ত্র
কবির শবদেহ কাঁধে নেয় অন্যতর জলযাত্রায়…








সুদীপ চট্টোপাধ্যায়

ফেরারি

মৃত মাছ, তোমার চোখের পাশে ধূপ জ্বাললাম
হাঁটু মুড়ে বসে দেখি—কিশোরবেলার সেই প্রসারিত মাঠ
                        স্ফটিক স্ফটিক তার স্বচ্ছ আবাস
শরীরে রুপোলি ঢেউ
প্রবল সাঁতারু নই, জল দেখে বারবার পিছিয়ে এসেছি
এসেছি হাওয়ার কাছে, সাগরদুহিতা সে

মৃত মাছ, তোমার চোখের কালো সাবধানে তুলে
                              খুঁজেছি তেমন কেউ
কপালে পরিয়ে দিয়ে বলাযায়—সাবধানে ফেরো
                 অথবা না আসো যদি—সাগরবেলায়
চোখের লবণ ছুঁয়ে ওই কালো টিপ
                 স্নানঘরে রেখে দিও ভেজা আয়নায়



সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়

তুলাদণ্ড


অর্থবহ নয়, তবু তাকে দিতে হবে পরমার্থ
সেইমত বৃত্তডাক, জলধিতরঙ্গ, লতাগাছ
নভোনীল আকাশ
। কুসম ভাঙা মেঘ। দিগম্বর
তুমুল তুলোট ভারী, গলে পড়ে জল
।


গাঁট গুনি, ষোলআনা
অক্ষরে অক্ষরে পরোয়ানা
জারি করি চোখের গোসল
ডুব দাও, মুষলধারায়।

যেভাবে কেটেছে দিন
কলমেরা কালি, এখানে সেখানে
আলাপ বুনেছি নেশাতুর স্বরলিপি যেন
সুতোগুলো পৃথিবীর গতি মাপছিল আর তলপেট।






অনিকেশ দাশগুপ্ত

বৃত্ত 

উৎসর্গে এসো
আমাদের মুলতুবী উপত্যকা 
বিস্তৃত সেতুর অধক্ষেপ
তোমার অনুরোধ জুড়ে ভুল ঠিকানা যেভাবে 
ঘনীভূত তৃষ্ণায়, 
তথাকথিত  মাংসেরা ঢেকে ফেলে নেশাচ্ছন্ন রুহ্
এবং মাংসেরা খোঁজে
                  আরো উন্নত মাংসের বিস্ময়

ভেঙে ফেলা রক্তিম ফুলদানি 
অথবা নিস্তেজ গোল্ডফিশের 
চোখ খোলা প্রাত্যাহিকতায়
        যেভাবে আটকে পড়ে নিজেদের বৃত্ত।


  
বহতা সময়

আরেকবার চোখ বুজি
পুরনো ঘরের মতো খুব চেনা শীতলতা
ঝুল বারান্দায় বিকেলের জীর্ণ আভা
ঘরে ফেরার যত অসম্ভব অনুশীলন
এই ঘরের ভেতর আরো  নিবিড় ঘর
এই ঘরের ভেতর মুখ ফেরানো  বিমর্ষ সময় ...

আমি তোমার দিকে তাকাই তবু আচ্ছন্ন পাহাড়
আমি তোমার দিকে কখনো বিশ বাঁও সংসার ...

নিষেধ,অরণ্য আর স্বতঃস্ফূর্ত জন্তুর দমক 
ঘষা কাঁচ আর নুয়ে পড়া অবকাশে -
এখনো তুমি রাস্তা ভুল করো  ,
এখনো তুমি মাঝদরিয়ায় চেঁচাও
                          ‘ঈশ্বর!হে ঈশ্বর!’












পিন্টু ঘোষ

মৌতাত

এ কোন স্পৃহায়, ভ্রমে মধুকর ওড়ে
                                 প্রায়ান্ধকারে
হসন্তিকা'র স্পর্শে ফিরে পায় প্রাণ
অযুত চিহ্ন আঁকে অশক্যে অভিলাষে
এবার চোখ খোলো হে মালঞ্চ
দেখো পুষ্পে কীটের সহবাস
কিভাবে গজলের সুরে রচিত হয় এক
                                 অপূর্ব মৌতাত
                   
রক্তস্নাত

একটা সম্পর্ক তুলে রাখো আগুনের পাশে
                    অথবা
একটা চরম সত্যের পাশে লিখে রাখো সুখ
শুধু অন্বেষণে ফুরালো দিন, কেটে গেল বেলা
                 এখন
পড়ে থাকা সম্বলটুকু ধ'রে বাঁচো, বাঁধো বুক
আঁধার জঠরে উঠেছিল ডাক ; স্তুতি
শুধু রক্ত স্নানে প্রাণের আহুতি ...
                        যা কিছু ছিল হৃদয়জাত
                        সবই আজ রক্তস্নাত
সবই আজ রক্তস্নাত




বিশ্বজিৎ লায়েক

বিজ্ঞাপন বিরতি 

১
পৃথিবী আর মহাবিশ্বের মাঝে
অই বিশ্বাস অবিনশ্বর
অই আবেশ আকষ্মিক
অই প্রতিসরণ অলীক পর্যটন

এবার রচিত হবে অপমান
                ক্ষুর চালিয়ে
কে কাকে চমকাচ্ছে
সসপ্যানে সেদ্ধ হচ্ছে ডিম
লন্ড্রীর ভিতর ঢুকছে লাল
, নীল, পতাকা
খাদ্য ও খাদকের একটাই সম্পর্ক
                         ছিদ্র অন্বেষণ

২
বিছানায় এসো। ঘুম আসছে না বলো।
নিজেকে নিজেই কাতুকুতু দিয়ে হাসাচ্ছ।
ছাদে অ্যান্টেনায় ঢুকে পড়ছে নীল
, সবুজ
হলুদ রঙ
কীভাবে মেলছো অশান্তি
অবিকল অব্যবহৃত ছিদ্রপথে
                         সাঁকোয়
                              সম্পর্কে
                                  গূঢ় ও গোপন
                                        মন্ত্রটুকু
পৃথিবীর ঘরে ঘরে এখন রাত্রির অসুখ

৩
জিজ্ঞেস করোনি খেয়েছি কিনা
ডুগডুগি বাজিয়ে চলে যাচ্ছে খেলনাওলা
সারা দুপুর অই জলে
, কাদায়
                               নিভেছে বারুদ
কেউ বর্ষায় এসে চলে যাচ্ছে বসন্তে
কালো জিরের দাগ লেগে আছে মনে
তুমি ফিরবে না
আমি একা একা বাড়ি ফিরে স্নান সেরে দেখি
ফুল ফোটে না
, পরাগরেণু উড়ে বাতাসে
কতটুকু উষ্ণ অই হৃদয়
আমার রাগের চেয়েও জেদি আর প্রবল জাগতিক
তুমি ফুরিয়ে গেছো জেনেও
শিরদাঁড়া সোজা রেখে ফিরতে হয়
পোড়া মাটির ঘরে
মনখারাপের উর্ধ্বে আমার ফেলে আসা
                              শুদ্ধ মফস্বলে

৪
আপাতত শেষ বলে
আয়নার সামনে দাঁড়ালাম

নিজেকে চিনতে কষ্ট হল
খুব দৈর্ঘ্য-প্রস্থে বেড়েছে আগুন
           ক্রমশ
              নিজেকে
                অচেনা লাগছে এই আলোয়
প্রতিটি ঘোরের পিছনে
কেন অশ্রুবাহী শোকের শ্রাবণ
মনখারাপ পাঠিয়েছ বিষণ্ণ জলে



তাপসকিরণ রায়

শ্যাওলা

প্রেমগুলি শ্যাওলা হয়ে যাচ্ছে,
রঙিন মাছের ঝাঁক এভাবেই গর্ভবতী হয়ে যাচ্ছে।
হাওয়া ও মাটিতে আপনি আপনি বীজ বপন হয়ে যাচ্ছে,
অযাচিত সমর্পণ ঘটে যাচ্ছে,
নারীর জঙ্ঘাদেশ বদলে যাচ্ছে।
আর সেগুলি উঠে আসছে হাওয়া ও মাটির স্পর্শে
একটা চুমু জন্ম নেমে। 
এমনি মোহে অজন্মা হয়েছিল,
অকাল ও দুর্ভিক্ষের বন জ্বলে খাক হতে পারেনি।
তবু আগামী আছে, শরীরের গভীরে
একটা ভ্রূণ গেঁথে গেছে।  আগাছা জন্মাচ্ছে,
একটা নর বীজ মাটিতে পুতে যাচ্ছে।
শত শত আগাছার মাঝে জন্ম ও মোহ
ঝকমারি ইলিগল এলিমেন্টস।




শুভম মুখার্জী

শীত 

শীতের কুয়াশা আদরের ভিড় ঠেলে চৌরাস্তার চারটে ফুটপাথে 
সমানুপাতিক হয়ে নেমে আসছে,
কবিরা ধোঁয়া হয়ে যাচ্ছে কেটলির আশেপাশে
স্কুলবাস নিপুনতায় বহন করে নিয়ে যাচ্ছে একটি ছোট্ট ডাক্তার
আর একটি বেকার যুবক
নামী মর্নিং স্কুলের বাচ্চার জুতোর ফিতে ধরে ঝুলে আছে একটি আকাশ
সমস্ত শিক্ষা ঝরে পড়ছে মেরুতে বরফ আর পশ্চিমে কম্বল হয়ে।

একটি শীতের সকাল ব্রেকফাস্টে জারি করে যায় সমবন্টনের ক্ষমতা
শিক্ষা অশিক্ষা বেকার ভাতা নতুন প্রেম
সকলেরই সমান ভাবে ঠান্ডা লাগা আবশ্যিক।



শুক্লা মালাকার

উত্তরণ

মনে পড়ে, হুল্লোড়ে কফি-হাউস?
পলাতক রোদ্দুরে রাঙানো গাল
নির্জন ময়দানের ষাস-ফড়িং
অবাঞ্ছিত কালবৈশাখীতে উড়ে যাওয়া উড়নি?
মনে পড়ে, তোমার উত্তরণ বিন্দু?

উড়ালপুলের বিলুপ্ত সীমানা ছাড়িয়েও
কোনও অজানা উচ্চতায়
উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর সামাজিক ঘেরাটোপে
আলোর স্রোত পেরিয়ে তুমি দেখবে
শুনশান জীবন,
নীরবতা ছাড়া কেউ নেই পাশে।

নীচে, বহু নীচে, শহরের রাস্তায়
সরু ফিতের মতো বন্ধু-পাড়া,
না-হওয়া প্রেম,খানদানি পিছুটান
রাত হয়ে ভেসে আছে।


অন্তহীন কোলাজ

কিছু টুকরো ছড়ানো কাঁচ
চেয়ারে পা তুলে বসে থাকা শরীর জানালায় উদাসীন
আকাশ খুঁজে পেরে আনে কুঁচি কুঁচি আলো
কাঁচের গায়ে সে আলো এঁকে চলে
অনাথ ছবির কোলাজ
সময়ের জলে দোল খেয়ে ছবিরা
ছোট ঢেউ তোলে
কখনো কখনো ডুব দিয়ে তুলে আনে
ছায়া ছায়া অতীত কিছু শব্দ  অর্থহীন

দোলনচাঁপার গন্ধে সেদিন এক ঝাঁক সাপ ঘিরে ধরেছিল
পাতার পর পাতায় মাখিয়েছিল বিষাক্ত লালা
দুর্গন্ধের যাতনায় ঘুমিয়ে পরেছিল মন, জীবন

এই জন্ম এমনি এমনিই অন্তহীন
চেয়ারে বসে পা তুলে জানালায় উদাসীন।
                    


এই শহর

নক্ষত্রের ফেলে যাওয়া চিঠি
খাজুরাহোর সঙ্গমরত ম্যুরাল
ঘুষ খেয়ে না হওয়া বৃষ্টি
বুকের ভেতর পচে যাওয়া ভালোবাসা,
ম্যাজিক হারিয়ে ফেলে
সময় ভুলেছে সুখের টুকরো কুঁচি।

শহর জুড়ে ভেসে আছে আধকলি গান
                  



বিশ্বরূপ বিশ্বাস


চিঠিগুলো

আলো ঘেঁটে যাওয়া বস্তির আনন্দ তামাম। আলোর পেরেক যেন ডিমের তারণ দুনিয়া ব্যেপে। বারণেও শাদা হয়। গাঢ় হলুদ হয় কুসুম। রাতজাগে। সিদ্ধ হয় চেপ্টানো কড়াইয়ে। কিমাকার কসরতে হ'য়ে যায় ভাজা ভাজা। আণ্ডার অনুরাগ।

পাকাধানের বাগানে কেউ পরিত্যাগ করে না মরাসন্তান। জনপথ কোজাগরী স্বর্গতনির্ঝরে মুখোমুখি গাছ হয়। কেটে দেয় আয়নার লঘুদেহ। শুচিস্নান। রুচিতে মোরগ ডাকে সারাটা উত্তাপে। পাহাড়ে পাহাড়ে শারদ আয়ুধিক চোট পায়।
পারিবারিক হোঁচট খায়।

প্রবেশের মাঠে যত দূষিত রক্ত। সংহত সন্ন্যাসী আনাড়ি প্রায়। লিখে পাওয়া উপছানো পার্কের রাস্তায় সরোবর হ'য়ে আছে ঋতুর দীঘি। জীবনের ফল ছেড়ে কোন পাখি নিবি বল। সম্ভবে আয়োজনে কতজনে ঘুমিয়ে স্বাগত হবে। বালিশের মান্যতা কোন প্রাণে হেঁটে যাবে বিছানায় বল।

চেয়েছি রাইফেল আমি কসাইদের দলে। অপমানে মরেনি যে জানোয়ার তার প্রমাণের ঠোঁটে কত কষ গড়ায়। দেখে নেবো এবার গুলি ক'রে চেপে ধ'রে। সংসারে খোরপোষ দিয়ে। তারপর খ'সে প'ড়বে যে মাংস মাটিতে থরথরিয়ে। তাকে নিয়ে যাবো পালিয়ে কফিনের দেশে। শাদা কাফনের দেশে।

যে প্রেসার কুকারে মসৃণ চালডাল ঢেলেছি। তার ভাপ হ'য়ে গ্যাছে জোনাকি পরিধির মাপে। আগুনের চাপে তার চুল্লিও জ্ব'লছে না। কি সহজে রান্না হ'তো গরমে নরমে। তা এখন হ'চ্ছে না উনুনের পাড়ায়। বারুদের পালকে। দেশলাইয়ের বাক্সে এখন। আগুন ডাকটিকিট জমায়।

বালতির কন্দরে যে অগাধ জল জ'মেছে। সে জলে স্নান ক'রলে জ্বর আসে না। মরচে ধ'রেছে যে শ্যাওলার খাঁজে। তার ভাঁজে ভাঁজে শালগ্রাম। পাথর। শিলা। গ্লাসের অতলে জলের সেতুসংরচন। সংক্ষিপ্ত পুকুর ভ'রে নাও খালের পানিতে।

মানুষের আড্ডায় কথা ব'লছে চোয়াল। বেদনার দিনটা কিভাবে যে কাটাজিভ নাড়িয়ে-চাড়িয়ে। ছুড়ে দিল অক্ষত চিঠিগুলি যোজনাকাশে। মেঘ তার প্রত্যুষের নির্ভীক ফয়সালা ক'রে পারলো না। ফেলে দিল চিঠিগুলো তাই। কাচগাঁথা পাঁচিলে।।



চন্দন বাসুলী

সাধুপুরুষ নই 

বলছি আমি সাধুপুরুষ নই 
একেবারে ধোয়া তুলসী পাতাও নই ।

রাস্তায় সুন্দরী কমলা দেখছিনা তা নয়
বাস স্টপে ৩৪- ৩২- ৩৪ দেখছিনা তা নয় ।

কিন্তু মা-ল বলতে পারছি না 
কিন্তু মা-গী ভাবতে পারছি না ।

সোনাগাছি যায়নি কোনোদিন 
একথা তোমরা কেউ বিশ্বাস করবে না ।

পুরো সোনাগাছিটাকেই বাড়িতে এনেছি 
অনেকেবারই কাটিয়েছি দীর্ঘ বেশ্যা রাত ।

যদি বলি পুজো না করেই দেবীকে বিসর্জন দিয়েছি 
তোমরা কেউ মেনে নেবে না আমাকে ; কেউই  না ।

পড়েছি ওদের বিভীষিকা রাতের না বলা গল্পগুলো 
শুনছি সোনালী মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বুক ফাটা কান্না ।

হিসাব করতে চেষ্টা করেছি ২৪ ঘন্টায় কতবার পূজিত হয়
ওই দেবীর চক চকে পাউডার মাখা পবিত্র মন্দিরটা ।

শুনেছি উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে বার বার লুটের আওয়াজ 
কাজলের গভীরে লুকানো ঝর্ণার অঝর জল পড়তে দেখেছি ।

বলছি আমি সাধু পুরুষ নই 
একেবারে খাঁটি সোনার টুকরোও নই ।

লোকাল ট্রেনের ক্যামরায় গরম রডের 
ঘর্ষন দেখেছি নরম দুটো বালিশের উপর ।

একটা কুঁড়ি গোলাপকে হাজার বার ধর্ষিত হতে দেখেছি 
দেখেছি দুটো ধর্ষক চোখের উলঙ্গ উল্লাস নৃত্য  ।

বেনামী অর্জুনকে নিরস্ত্র হয়ে লড়তে দেখেছি
তবু আমি মানুষ হয়েও মানুষের আচরণ পারিনি করতে ।

বলছি আমি সাধুপুরুষ নই 
একেবারে হিরের টুকরোও নই ।




অভিজিৎ দাশগুপ্ত

তুমি ও তোমার সম্পর্ক
    
তুমি আকাশের দিকে হাত বাড়ালেই,
আকাশ যে তোমার দিকে হাত বাড়াবে ,
তা কিন্তু নয়।
তুমি মাটির দিকে তাকালেই,
মাটি যে তোমার দিকে তাকাবে,
তা কিন্তু নয়।
তুমি প্রকৃতিকে ডাকলেই,
প্রকৃতি যে তোমার ডাকে সাড়া দেবে,
তা কিন্তু নয়।
তার আগে তোমাকে
সম্পর্কের বাঁধন মজবুত করতে হবে।
তার আগে তোমাকে
বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করতে হবে।
সম্পর্ক একদিনে হয় না,
বিশ্বাসযোগ্যতা একদিনে অর্জন করা যায় না।
এর জন্য নিরলস প্রয়াসে ডুবে যেতে হয়।



জাতিস্মর

দোকানী

স্মৃতির কাঠে ঘুণ ধরে যায় সময় সুযোগ বুঝে
নিংড়ে নেওয়া হৃদয় নিয়ে বন্ধু খুঁজি আমি;
হিসেব কষে বাঁচার কোনো উপায় পেলে খুঁজে
স্তব্ধ হওয়া প্রাণের চেয়ে শব্দ ভীষণ দামী।

হোঁচট খেয়ে ভাবতে বসি জীবন কেন ধাঁধা?
চাঁদের হাসির চমক মেপে একলা পথে হাঁটি।
নিজের চোখে কঠিন কত স্মৃতির রুমাল বাঁধা;
এই কথাটাই বুঝছি এখন দিনের আলোয়,খাঁটি!

তোমার নামই বলতে থাকি উল্কা খসা গুনে
ঠোঁটের কোণে চুমুর হিসেব কবেই গেছে চুকে।
চিবুক ছোঁয়া জলের কোনো শান্ত ফোঁটা শুনে,
অবুঝ রাতেও স্বপ্ন দেখার সাহস রাখি বুকে।

কয়েকশো বার ভেজার পরেও পারলে না ভুল ধুতে
বারবার তাই হারিয়ে ছাতা আজও আমি দোষী।
মিথ্যে সাহস যোগাও এখন, নতুন করে ছুঁতে
তবু শেষ অবধি পথের ধারেই মন বেচতে বসি।






সায়ন্তনী হোড়

ঘনত্বের হিসাব

পাতার ঘনত্বে ঢেকে যায়
মৃতপ্রায় গাছের শরীর।

তবুও মনের ঘনত্ব কে অদৃশ্য
রামধনুর সাথে মিশিয়ে দিই।

মিথোজীবীর শিকড়ে আজ এক
নতুন উৎসবের আভাস
ক্রমশ বাড়তে থাকা মন খারাপের স্ফুটনাঙ্কে
কবিতার শব্দরা থিকথিক করছেবি।
শহরতলিতে জেগে ওঠে
বাস্তবের ভিজে যাওয়া রঙতুলি।

আদুরে জোছনার ঘাম কে
শুষে নিচ্ছে পোড়ো সব উপন্যাসরা। 
                                        




অনামিকা দত্ত

একীভূত

প্রেমিক হব আমি পাহাড়ি ঝর্ণার মতো
অঝোরে ঝরবো কঠিন শিলাস্তরে।
জানি কোনদিন কঠিন প্রস্তরের বুক চিরে
ফুটবে না প্রেমের ফুল,
তবু তার দুর্নিবার আকর্ষণে বার বার
আছড়ে পড়ব!
সেই সাথে উঠবে কত সুর ; উঠবে
শব্দের ঝংকার।
আমার স্রোতের খরতায় সে হারাবে
তার অবয়ব; আমাতেই হবে দ্রবীভূত।


কাব্যাত্মা

কবিতা লিখতে বসলে মনে পড়ে
একটা মুখ,
সেটা নিজের; অনেকটা আত্মদর্শন।
কবিতার ভাষাটা যেন সেই দর্শনের
লেখ্যরূপ, আর...
তার বিষয়টা হল আত্মা।
চেতনায় ঘটে চলা আত্ম-রোমন্থন,আত্ম-বিশ্লেষণ
ছত্রে ছত্রে ফুটে ওঠে কবিতার।
তবু তাকে চিনে নিতে হয় দেরি!
বুঝি, আজও নিজেকে জানতে বাকী।





Saturday, October 17, 2015

জয়ন্ত দেবব্রত চৌধুরী

সোমনামবুলিসম

এখন দীর্ঘ ঘুম। বর্ণহীন শব্দহীন স্পর্শহীন ঘুম। খসে যাওয়া তারার খসখসে গায়ের মতো হিমেল ঘুম। চেতনার অতলে ঘুম। আদিমধ্যঅন্ত জুড়ে ঘুম। নেত্রপল্লবহীন নিদ্রা। অস্থিহীন অস্তিত্বহীন অনন্তশয্যা।
তবে পৌর্ণমাসীর গোলচে আলোয় নিঃস্পন্দ কোনো শ্মশানে শেয়ালের ডাকে একদিন আমার ঘুম ভাঙবে। পূবের আকাশে কখনো জোড়া রামধনু উঠলেই বুঝবো যে আমার ফেরার সময় এলো। গহিন কাশের ঝোপে সফেদ ঢেউ খেললে আমিও তখন গাঝাড়া দেবো। মহানন্দা কখনো ঋতুমতী যুবতী হলে আমিও তখন কলার ভেলায় চেপে ভেসে পড়বো অচিনের উদ্দেশে। শীতঘুম থেকে জাগবো, যেমন রুক্ষ পাথরের বুক ফুঁড়ে জাগে নবীন চারাগাছ। সহস্র সূর্যের তেজ নিয়ে নয়, হাজার ফুলের নির্যাস মাত্র নিয়ে ফিরবো। জীর্ণ এ বস্ত্র রিফু করেও তখন ফিরবো কোনোক্রমে। শরতের কোনো অকালবোধনে অকস্মাৎ ফিরবো যেমন বছর ঘুরলে মেয়ে বাপের ঘরে ফেরে দিন তিনেকের জন্য। যেমৎ বৎসরব্যাপী বিপ্লবদমনে ক্লান্ত রাজা ফেরেন শতেক শবদেহ পেরিয়ে দিব্যকান্তি বাহনে। ফিরবো যেমন অহল্যা ফেরে শাপমোচনের পরে, চন্দ্রদেব ফেরেন রাহুমুক্তি ঘটলে। যেমন বর্ষা ফেরে দহনের ক্ষতে মলম বোলাতে; যেমন কল্কি ফিরবেন একদিন ধর্ম ফেরাতে।
দেখো, চন্দনার শোকে বিভোর এক বিষণ্ণ বিকেলে আমি ফিরে আসবো। ফিরবোই শেষ অবধি।