Thursday, December 25, 2014

প্রবন্ধ ১

কবিতাই মানুষের কথা
অরূপম মাইতি

“কার্যত বিধ্বস্ত কবি এরপর চলে যান প্যারিস। তারপর প্যারিস থেকে লন্ডন। লন্ডনে থাকতে কবি, প্যালেস্টিনিয়ান লিবারেশন ফ্রন্ট, আলজেরিয়ার আন্ডারগ্রাউন্ড মুভমেন্ট, সাউথ আফ্রিকার বর্ণবিদ্বেষী বিরোধী আন্দোলন, ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।”


-আপনি না কলেজের অধ্যাপক? ছেলে-ছোকরাদের ফিচলেমিতে কেন নিজেকে জড়ালেন? 

-ছেলে-ছোকরারা অসামাজিক কাজ করেছে কি? করেনি! তবে হ্যাঁ, এদের লেখাকে যেভাবে অশ্লীল এবং অসামাজিক বলে চিহ্নিত করবার চেষ্টা চলছে, সেটা আমি মানতে রাজি নই। 

কলকাতা পুলিশের দুঁদে পুলিশ কমিশনার পি কে সেন তাঁর ধমকানির উত্তরে এমন স্পষ্ট ভাষণ শুনতে তৈরি ছিলেন না। কবিরা সমাজ বদলাতে পারে না ঠিকই, তবে সমাজের অবস্থানকে তার লেখায় তুলে ধরতে পারে আর সেই লেখা সমাজকে দিশা নির্দিষ্ট করতে সাহায্য করে। ১৯৬২-৬৪ সাল। সারা বাংলা জুড়ে একটা অস্থির পরিস্থিতি। সেই সময়ে সমীর রায়চৌধুরী, মলয় রায়চৌধুরী, শৈলেশ্বর ঘোষ, দেবী রায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল, সন্দীপন তাঁদের লেখা দিয়ে এমনই একটা কাজ করছিলেন, যাকে হাংরি আন্দোলন বলা হয়। এই আন্দোলন কোন সংগঠিত আন্দোলন ছিল না। নিয়ন্ত্রণের অভাব যেমন ছিল, প্রকাশও বিক্ষিপ্ত। 

সমীর রায়চৌধুরীর চাইবাসার বাড়িতে আড্ডা বসত। আমার এই লেখা যাকে নিয়ে, সেই কবি তখন সদ্য বি এ পাশ করেছেন আশুতোষ কলেজ থেকে। চাকরির সন্ধান করতে করতে হঠাৎ সুযোগ এসে যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে জিওলজিতে অনার্স নিয়ে পড়ার। জিওলজি পড়ার সুবাদে ফিল্ড ওয়ার্ক করতে চাইবাসায় আগমন। তারপর যথারীতি আড্ডা মারার লোভে সমীর রায়চৌধুরীর বাড়ি। সুনীল, শক্তি, সন্দীপনের সঙ্গে তরুণ কবিও আন্দোলনে জড়িয়ে পড়লেন। এম এস সি পড়া শেষের প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আশুতোষ কলেজে প্রভাষকের চাকরি। প্রশাসন তখন চাইছে আন্দোলন ভাঙতে। কলকাতা পুলিশের কর্তারা কবি-সাহিত্যিকদের বেছে বেছে পুলিশের সদর দপ্তরে ডেকে এনে হেনস্থা করছেন। তরুণ কবিও বাদ যাননি। সে যাত্রায় রক্ষা পেলেও পরে আবার ডাক পড়ে। মহামান্য আদালতের কাছে বলপূর্বক রীতিমত বলতে বাধ্য করা হয় যে আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত কবি-সাহিত্যিকরা অসামাজিক কর্মে লিপ্ত, তারা অপরাধী। জনৈক কবিও আর চাপ সহ্য করতে পারেননি। আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি জবানবন্দী দিলেন।

 -আমি অবিবাহিত, আমার বয়স ২৮ বছর। বর্তমানে আমি ২৩ রয়েড স্ট্রীটে থাকি। আমি জিওলজিতে এম এস সি এবং আশুতোষ কলেজের প্রভাষক। ১৯৬২ সনে বা তার কাছাকাছি কোন এক সময়ে হাংরি পুস্তিকা আমার চোখে পড়ে। আমি সাহিত্য আন্দোলনে আগ্রহী ছিলাম। পরে আমি মলয় রায়চৌধুরীর সঙ্গে পরিচিত হই। যদিও তার বড় ভাই সমীর রায়চৌধুরীকে আমি আগে থেকে চিনতাম। কলেজ স্ট্রীট কফি হাউস এই আন্দোলনকারীদের আড্ডা মারার জায়গা। কিছুকালের মধ্যে হাংরি আন্দোলনের অন্যান্য শরিক যেমন শৈলেশ্বর, সুভাষ, দেবী রায় ওরফে হারাধন ধাড়ার সঙ্গে পরিচয় হয়। তাদের অনুরোধে বিভিন্ন সময়ে হাংরি পুস্তিকায় গদ্য ও কবিতা লিখেছি। কোথা থেকে ছাপানো হত, আর কে তার খরচ যোগাতো আমি জানি না। ১৯৬৪ সনে গ্রীষ্মে মলয় পাটনা থেকে কলকাতা আসে ও আমাকে প্রকাশিতব্য পুস্তিকার জন্য লেখা দিতে বলে। আমি কুসংস্কার নামে একটা লেখার পাণ্ডুলিপি ব্যক্তিগতভাবে মলয়কে দিই। তারপর আমি দুমাসের জন্যে ডালহৌসি চলে যাই এবং কলকাতা ফিরে আমি আলোচ্য পুস্তিকাটি দেখতে পাই। পরে ডাকযোগে একটা কপি পেয়েছি। আমার মতে মলয় রায়চৌধুরীর লেখায় নিদারুণ বিরক্তি ও অসম্ভাব্যতার উপলব্ধি থাকে। আমি মনে করি তাদের সাহিত্য আন্দোলন নৈতিকভাবে কলুষিত হয়ে গেছে এবং আমি হাংরি আন্দোলন থেকে নিজেকে আলাদা করে নিয়েছি। 

এইভাবে কবিকুলকে নিয়ে যখন টানাহ্যাঁচড়া চলছে, তখন আমেরিকার বিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনে কয়েক জন কবির ছবি সহ হাংরি আন্দোলন নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি আশুতোষ কলেজ কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। কলেজ কর্তৃপক্ষ একটি কমিটি তৈরি করেন। 



সেই কমিটির সুপারিশে কলেজের প্রভাষকের চাকরি থেকে তরুণ কবিকে অপসারিত করা হয়। কার্যত বিধ্বস্ত কবি এরপর চলে যান প্যারিস। তারপর প্যারিস থেকে লন্ডন। লন্ডনে থাকতে কবি, প্যালেস্টিনিয়ান লিবারেশন ফ্রন্ট, আলজেরিয়ার আন্ডারগ্রাউন্ড মুভমেন্ট, সাউথ আফ্রিকার বর্ণবিদ্বেষী বিরোধী আন্দোলন, ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদি বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। একটি স্কুলে শিক্ষকতার চাকরিও করতেন। 

এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, কলকাতার কবির বিদেশে যাওয়ার আসল উদ্দেশ্য ছিল জীবিকার সন্ধান। কলকাতায় থাকতে কবিতা ও অন্যান্য লেখার জন্য যে কবিকে হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়েছিল, লন্ডনে থাকতে সেই কবি ছিলেন কবিতা থেকে অনেক দূরে। এই শহরে থাকতে আলাপ হয় সান্ত্বনা দেবীর সঙ্গে। তিনিও তখন লন্ডনে চাকরি করছেন। দুজনে মিলে সংসার পাতলেন নর্থ লন্ডনের ৩৬ হিলফিল্ড অ্যাভিন্যুতে। কবিতার জগত থেকে অনেক দূরে ঘোর সংসারী কবি তখন জীবন কাটাচ্ছেন পরম আনন্দে। সময় পেলেই তাঁর ছোট্ট গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ছেন ঘুরতে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। ভাল লাগলে, গাড়িতে রাখা ছোট্ট তাঁবু বের করে সেখানেই আস্তানা গেড়ে ফেলছেন।

তবে একজন স্বভাব কবি কত দিনই বা পারেন কবিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকতে। বিদেশের মায়াও ধীরে ধীরে ফিকে হচ্ছিল। সাথে সাথে নিভৃতে অন্তরালে কলমের গতিও ছিল অবিরত। ১৯৭৮ সনে কলকাতা ফিরে যোগ দিলেন চিত্রবাণী পত্রিকায়। চিত্রবাণী প্রকাশিত হত সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের শিক্ষামূলক গবেষণা কেন্দ্র থেকে। এই গবেষণা কেন্দ্রটি পরে ইউ জি সি অধীনে চলে যায়। পরবর্তী কালে কবি সেখানে পূর্বাঞ্চলের অধিকর্তার পদে আসীন হন। প্রায় একই সময়ে কবি ন্যাশনাল বুক এজেন্সির উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য নির্বাচিত হন। যে সময় কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর উদ্যোগে কবির লেখা, দেশ পত্রিকার পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত হয়, সে সময় কবির লেখা পূর্বাশা পত্রিকাতেও ঠাঁই করে নিয়েছে। চোদ্দ বছরের ব্যবধানে, লন্ডন থেকে কলকাতায় ফিরে কবি দেখলেন তাঁর প্রায় সব কৃত্তিবাসী বন্ধুই সংবাদ মাধ্যমে বেশ ভাল ভাল জায়গায় কর্মরত। এমন একটা অবস্থা যে লেখা পাঠালেই, প্রকাশ মোটামুটি নিশ্চিত। তবে কবি সে পথ মাড়ালেন না। 

কবি আছেন সব কিছুতে, আবার কোন কিছুতেই নেই। ঘুরে বেড়ান আপন খেয়ালে। লিখতেই হবে, এমন বাধ্যবাধকতা নেই। সমসাময়িক বন্ধুকবিদের মত তাঁর স্তাবককুল নেই। সব কিছুই যেন কেমন একটা ঔদাসীন্যে ভরা। বাণিজ্যিক পত্র-পত্রিকায় লেখা ছাপানোর আগ্রহ নেই। লিটল ম্যাগাজিনই তাঁর জগত। তারাই দায় নেয় তাঁর কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের। লিটল ম্যাগাজিনই তাঁকে পুরস্কৃত করে। তাঁর কথায়, “মানুষের প্রবণতাই হচ্ছে, আত্মপ্রকাশ করা। সে তাই কবিতা লেখে, কবিতা লিখেই আত্মপ্রকাশের চর্চা করতে থাকে। আত্মপ্রকাশের প্রবণতা না থাকলে হয়ত মানুষ আর কবিতা লিখবে না। কিন্তু আত্মপ্রকাশের আকাঙ্ক্ষা কি কোন দিন থেমে যেতে পারে?” ২০১১ সনে সপ্তর্ষি থেকে প্রকাশিত ‘পিয়া মন ভাবে’, তাঁর সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থের জন্য আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে দিল্লিতে সাহিত্য আকাদেমির এক অনুষ্ঠানে কবি উৎপল কুমার বসুর হাতে তুলে দেওয়া হবে এ বছরের সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার ২০১৪।


প্রবন্ধ ২


বাজার এবং অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা
ই ন্দ্র নী ল  সে ন গু প্ত

“আমরা আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করে তার ফায়দা তুলব কিনা, দেশে সুপার মার্কেট ঢুকতে দেবো কিনা এ নিয়ে যত রাজনীতি হবে ততই আমরা পিছিয়ে যাব।”

যার যে বিদ্যায় বা ক্ষমতায় পারদর্শিতা আছে তাকে সেখানেই উৎকর্ষতা লাভ করতে হবে এবং ফল স্বরূপ উৎপাদিত পণ্য বা পরিষেবা বাজারজাত করতে হবে। বস্তুত এটাই বিশ্বায়নের মূল কথা- আর বিশ্বায়নের হাজার কুফল সত্ত্বেও অদূর ভবিষ্যতে বিশ্বায়নের হাত থেকে অব্যাহতি পাবার লক্ষণ অন্তত আমার নজরে পড়ছে না।

আমি যে বাজারে যাই না তার কারণ কিন্তু এই নয় যে আমি বাজার করতে ভালবাসি না। আসলে গৃহিণীই আমাকে দিয়ে বাজার করাতে ভালোবাসেন না। ওর অভিযোগ যে আমি সস্তা খুঁজতে গিয়ে আসলে ঠকে আসি। কিন্তু কি করব? বাজারে গিয়ে মানুষ দরদাম করবে না, হয় নাকি? আর এটা তো সবাই জানে যে তুমি যত বেশি জিনিষ নেবে দাম ততই সস্তা হবে। তখন কি ছাই খেয়াল থাকে যে বাড়িতে আমরা দুটি মোটে প্রাণী। এ ছাড়াও আরও সমস্যা হয় তরকারি নিয়ে। পাঁচমিশেলি তরকারি রাঁধতে হলে একটু কুমড়ো একটু বেগুন কিছুটা সজনে ডাঁটা সামান্য আলু একটু বড়ি এইসব লাগে। কিন্তু বাজারে গলদঘর্ম হয়ে ঘুরতে ঘুরতে অতো মনে থাকলো না। ফলে হয়ত অতিকায় একটি লাউ সঙ্গে কিছুটা পুঁইডাঁটা এবং প্রচুর আলু পেঁয়াজ কিনে বাড়ি ফেরার পর ভুলটা বুঝতে পারলাম। ততোক্ষণে ভুল সংশোধনের জন্য গৃহিণী নিজেই আবার বাজারে রওনা দিয়েছেন। তাঁকে যেতেই হবে, কারণ একটি সুনির্দিষ্ট তরকারি তার মানসচক্ষে তিনি দেখতে পাচ্ছেন। সবকটি উপকরণ চাই। অন্যথা চলবে না। 

আমার প্রিয় রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য মহাশয়কে আমি যে কটি কারণে শ্রদ্ধা করি তার প্রধান হলো, তাঁর বাজারপ্রিয়তা। রন্ধন-ব্যঞ্জন-ভোজনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম দিকগুলি তাঁর নখদর্পণে- এ তাঁর লেখা পড়লেই বোঝা যায়। 

যাই হোক এক বিকেলে বন্ধু আশিসের পাল্লায় পড়ে ওঁর সঙ্গী হয়ে বাঁশদ্রোণী বাজারে গেছিলাম। যাচ্ছি শুনে সহধর্মিণী একেবারে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচী ঠিক করে দিলেন। দুটি বেল- গরমের দিনে বরফ দিয়ে বেলপাতার নানা উপকার, একটি পাউরুটি এবং কিছু মিষ্টি কিনে ফিরলাম।

কিন্তু আসল বিষয়টা অন্য। বাজারে ঢেলে বিক্রি হচ্ছে চিনা আর অ্যামেরিকান আপেল। আমদানি করা। দাম যথাক্রমে ১৮০ ও ২২০ টাকা কিলো। অনেক জিনিষেরই খবর রাখি না। এটা নিশ্চয়ই নতুন কিছু নয়। কিন্তু আমি জানতাম না।


কিছুটা গর্ব হলো, আমাদের তাহলে আর্থিক অবস্থা ভালোই হয়েছে। অত দূর দেশ থেকে পরিবহণের পেছনে খরচা করেও প্রচুর পরিমাণে আমদানিকৃত সামগ্রী ফলের দোকানে শোভা পাচ্ছে। কিন্তু আমরা কিছু বেচতে পারছি কি?
ফল আমদানি করছি আর ঘরের ছেলেমেয়েদের অ্যামেরিকা ইয়োরোপ নিদেন পক্ষে দিল্লী, মুম্বাই, হায়দ্রাবাদ, ব্যাঙ্গালোর রপ্তানি করে বসে আছি, অথচ খোদ অ্যামেরিকাতেই ব্যাটারি থেকে বাল্ব, মাটির বাটি থেকে ছবির ফ্রেম, কম্পিউটার থেকে পেন্সিল, ইলেকট্রিক্যাল থেকে ইলেকট্রনিক্স, সমস্ত কিছু আমদানি করা হচ্ছে চিন নামক আমাদের প্রতিবেশী দেশ। বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। জামাকাপড়ের আন্তর্জাতিক ব্যবসায় একচেটিয়া প্রাধান্য বাংলাদেশের। অথচ ভারতীয় বস্তুর হাতে গোনা প্রাধান্য। জেমস জুয়েল্রি বলতে পারব না, তবে কিছু জামাকাপড় ও ল্যাম্পশেড আর টুকটাক ঘর
সাজানোর মোমবাতি, জুট ব্যাগ, জুট কার্পেট ইত্যাদি নজরে এসেছে। অথচ প্রচুর চিনা পণ্য এমন দেখেছি যে একই মান পরিমাণের দেশি পণ্যের দাম ভারতে এক চতুর্থাংশ। 

আমরা আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ত করে তার ফায়দা তুলব কিনা, দেশে সুপার মার্কেট ঢুকতে দেবো কিনা এ নিয়ে যত রাজনীতি হবে ততই আমরা পিছিয়ে যাব। যে যুক্তি দেখানো হচ্ছে তা অনেকটা রেলগাড়ি চালু হলে ঘোড়ার গাড়ির গাড়োয়ানের চাকরি যাবে বা কম্পিউটার এলে কেরানির চাকরি যাবে গোছের যুক্তি। যা আদপে ধোপে টেঁকে না। সমস্ত কেনাবেচা যদি সংগঠিত ভাবে হয় তবে প্রচুর সেল ট্যাক্স ইনকাম ট্যাক্স ইত্যাদি সরকারী কোষাগার সমৃদ্ধ করবে যা থেকে অনেক কল্যাণমূলক কাজ হতে পারে। পণ্য উৎপাদন পরিবহণ নিশ্চিত করার জন্য সারাদেশে যোগাযোগ ব্যবস্থা কোল্ড স্টোরেজ ইত্যাদি তৈরি হয়ে যাবে বাজারের প্রয়োজনে এবং বিনিয়োগে। যে পরিমাণ কর্ম সংস্থান হবে তাতে বহু মানুষের রুজি রোজগার নিশ্চিত হবে। চাষি এবং ক্ষুদ্রশিল্প উৎপাদিত বস্তুর নিয়মিত বাজার পাবে। খুচরো ব্যবসার নামে যে অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা আমাদের মহল্লাগুলোকে রাস্তাঘাটগুলোকে গ্রাস করছে তার হাত থেকে সাধারণ মানুষ অনেকটা রেহাই পাবে। কোন সভ্য দেশই বাজারের নামে ফুটপাথ দখল করে ট্যাক্স প্রদানকারী পথচারীদের জীবন বিপন্ন করে পথ চলতে বাধ্য করে না। 

আমাদের দেশে কোন জিনিস কিনলে তার মান সম্পর্কে এমন গ্যারান্টি কেউ দেবে না যাতে পয়সা ফেরত পাওয়া যায়, এমনকি মাল বদলেও নেওয়া যায়। কিন্তু অ্যামেরিকাতে কেনার পরে ফেরত দিয়ে পয়সা নেবার হক ক্রেতার সব সময় থাকে, সে জামাকাপড় বা মোটর গাড়ি যাই হোক না কেন। যথেষ্ট সময় পাওয়াও যায় সেজন্য। এই কারণেই স্বভাবতই বাজে মাল গছিয়ে পয়সা নেবার গল্প এদেশে চলে না। সামগ্রিকভাবে দেখতে গেলে এতে সবারই লাভ। নিশ্চিন্ত মনে কেনাকাটা করতে পারলে অর্থনীতির উন্নতি যতটা ঘটে তাতে ব্যবসাপাতির সামগ্রিক লাভ অনেক বেড়ে যায়। প্রতিযোগিতার ফলে মানেরও আকাশ পাতাল ফারাক ঘটে। 

কবে যে আমরা সাবালক হবো, কে জানে! অদূরদর্শী তাৎক্ষণিক ফাটকাবাজ ব্যবসায়ী, চিটিংবাজ আর তোলাবাজরাই আমাদের দেশে সততার শতকরার হিসেবটা গুলিয়ে দেয়। আমরা ঠকা আর ঠকানো দুটোকেই জাতীয় চরিত্রের অঙ্গ করে নিয়েছি। সবাই চটজলদি কিছু মুনাফা করে চম্পট দিতে ব্যস্ত। কবে কীভাবে মুক্তি আসবে কে জানে? আমরা না হতে পারলাম উৎকৃষ্ট পুঁজিবাদী, না আঁকড়াতে পারলাম উপযুক্ত সাম্যবাদ। না ঘরকা না ঘাটকা অভিমুখ বিহীন মানবগোষ্ঠী আমরা নিজের রূপে নিজেই পাগল, বিশ্বের দরবারে ঠাঁই পেতে অনেকটা পথ হাঁটা বাকী।


Friday, September 19, 2014

নিবন্ধ

ভিনদেশে দুর্গাপুজো

চি র ঞ্জি ত  দ রি পা 

“ধারে আর ভারে হয়তো কলকাতার পুজো থেকে পিছিয়ে কিন্তু আবেগ আর ভক্তিতে বেশ টেক্কা দেয়। বিদেশে এতো বড়ো দক্ষ যজ্ঞ করা সহজ নয়। এরা শারদ সম্মানের জন্য লড়াই করেনা। বাঙালি নাড়ির টানে প্রতি বছর মাতৃ আরাধনা করে। সেখানে লাভ-ক্ষতির অঙ্ক মেলেনা।''


বিদেশে দুর্গাপু্জো, কথাটা শুনে আগে  লোকে  বলতো দুধের সাধ  ঘোলে মেটানো। কিন্তু সময়ের সাথে দুধ আর  ঘোলের পার্থক্য কমে যাচ্ছে। দশটা বাঙালি পশ্চিমবঙ্গের বাইরে মিলিত হলে একটা দুর্গা পুজোতো হবেই। সেই সূত্রে আমেরিকার বিভিন্ন শহরে প্রবাসী বাঙালিরা দুর্গাপুজো করে। নিজের  অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি সেখানে বাঙালি আনা কোন অংশে কম যায় না।

শুরু থেকে বলতে গেলে পুজো কমিটির কথা প্রথমে আসে । আমেরিকাতে পুজা কমিটি  বলতে বাঙালি অ্যাসোসিয়েসেন অফ “অমুক” নামটাই বেশি চলে, যেমন - ‘বাঙালি অ্যাসোসিয়েসেন অফ সাউদার্ন ক্যালিফর্নিয়া’ (দিয়ারটি শহর,লস অ্যঞ্জেলাস কাউন্টি,  ক্যালিফর্নিয়া রাজ্য) এর পাশাপাশি  ‘সনাতন বাঙালি’, ‘বে এরিয়া প্রবাসী’ (শ্যবো কলেজ, হ্যওয়াড শহর ,ক্যালিফর্নিয়া রাজ্য; এটা প্রায় ৪০ বছরের পুরনো), প্রবাসী পুজো  নাম ও চলে। অথবা জায়গার নামেও পূজা কমিটি হয়, যেমন - ‘নিউ ইয়র্ক পুজো অ্যাসোসিয়েসেন’, ‘ইস্ট কোস্ট দুর্গা পুজো অ্যাসোসিয়েসেন’ ( নিউ ইয়র্ক)।  ওয়েবসাইট এর নামও হয় পুজো কমিটির নামে।

বেশির ভাগ পুজো কমিটিরই থাকে নিজস্ব ওয়েবসাইট। বিদেশে বাঙালিদের কাছে পৌঁছানোর অন্যতম উপায়। সারা বছর ওয়েবসাইট পুরানো বছরের ছবি কাঁধে করে  ঝিমোতে থাকে, কোন হেলদোল থাকে না। পুজোর ঠিক আগে ঐ সাইটগুলো জেগে ওঠে। পুজার নির্ঘণ্ট, স্থান আর যে শিল্পী এবারে পুজোর প্রধান আকর্ষণ তার নাম, ছবি দিয়ে। অনলাইনে সদস্যও হওয়া যায়।

মূলত সদস্য এর চাঁদাতেই প্রতিটি পুজো চলে। দান আর বিজ্ঞাপন থেকে আরও কিছুটা আয় হয়। বিভিন্ন স্তরের সদস্য থাকে। ধরুন আপনি একা হলে সদস্য হতে লাগবে ৫০-১৩০ ডলার প্রতিদিনের (১ ডলার = ৬০ টাকা)। সস্ত্রীক হলে সেটাই  দ্বিগুণ হয়ে যাবে।  সদস্য  হলে পুজোর দিনগুলোতে দুপুরে আর রাত্রিতে প্রসাদ খাওয়া, সাথে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ। পুরো বছরের সদস্য হলে - দুর্গাপুজোর সাথে লক্ষী পুজো, কালীপূজো আর পিকনিক এর একটা প্যাকেজ পাওয়া যায়। আপনি সদস্য না হলেও প্রতিমা দর্শনে কোন বাধা নেই। এছাড়াও আছে প্লাটিনাম, গোল্ড আর সিলভার সদস্য। পরিমাণটা একটু বেশি; ২০০০ থেকে ৫০০০ ডলার। এরা স্থায়ী সদস্য।


এবার আসি প্রতিমাতে। অনেক এক্সপোর্ট  কোম্পানি আছে যারা এক চালা, তিন চালা, পাঁচ চালা প্রতিমা কলকাতা থেকে পোঁছে দেয় আমেরিকার বিভিন্ন শহরে। মাটি থেকে সুরু করে পেপার পাল্প, থার্মকল, ফাইবার গ্লাস এর মূর্তি পাঠানো হয়। বিদেশে বিসর্জনের অনেক ঝামেলা। কিছু  পুজো কমিটি প্রতিমা বাক্স বন্দি করে রেখে দেয়। পরের বছর আবার সেই মূর্তি  পুজো করে।

পুজোগুলো হয় স্কুলের মাঠে বা কমিউনিটি হলে। এর জন্য পুজো  কমিটিকে ভালো রকম ভাড়া গুনতে হয়। পুজোর চারদিন আসে পাশের থেকে সব বাঙালি জড়ো হয় পুজো মণ্ডপে ।বাঙালি বলতে পশ্চিমবঙ্গ আর বাংলাদেশ দুই। বাঙালি পোশাকে পুজো প্রাঙ্গণ ভরে যায়, দেখে মনে হয়না  বিদেশে আছি। বিদেশে, বাঙালি প্রমীলাদের শাড়ি আর গহনার সম্ভার সারা বছর  ম্লান হয়ে থাকে, জেল্লা দেখা যায় পুজোর চারদিন।


কথায় আছে কালচারাল বাঙালি, বিদেশে বাঙালি কালচার বজায় রাখতে একটা সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা তো রাখতেই হয়। সব পুজো কমিটি চেষ্টা করে  কলকাতা, মুম্বাই থেকে বিখ্যাত শিল্পীদের নিয়ে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা আয়োজন করতে, সপ্তমী থেকে নবমী। যে এলাকায় ঐ দুর্গাপুজো হচ্ছে সেখানকার বাচ্চাদের (বাঙালি) নিয়েও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয় যাদের জন্ম  আর  বড় হওয়া এদেশেতে। শতকরা ১০০ ভাগ বাঙালি সুবাস। সেও ইন্দ্রিয়ের জন্য এক দারুণ অভিজ্ঞতা। (আমেরিকার অনেক শহরে ভারতীয় নৃত্য শেখানোর স্কুল আছে)।

বাঙালি আর খাওয়ার কথা না বললে পুজোর গল্প পূর্ণ হয়না । খিচুড়ি ভোগ তো থাকেই, পুজো প্রাঙ্গণে অনেক ছোটো ছোটো  স্টল বসে, এখানেও কষা মাংস, এগ রোল থেকে শুরু করে মটির ভাঁড়ে চা, সবই পাওয়া যায়। এছাড়া কিছু স্টল থাকে শাড়ি, গহনা ইত্যাদির জন্যও।


সব কিছু মিলে আমেরিকাতে পুজো বেশ জমজমাট। ধারে আর ভারে হয়তো কলকাতার পুজো থেকে পিছিয়ে কিন্তু আবেগ আর ভক্তিতে বেশ টেক্কা দেয়। বিদেশে এতো বড়ো দক্ষ যজ্ঞ করা সহজ নয়। এরা শারদ সম্মানের জন্য লড়াই  করেনা। বাঙালি নাড়ির টানে প্রতি বছর মাতৃ আরাধনা করে। সেখানে লাভ-ক্ষতির অঙ্ক মেলেনা।

তবে এখানের পুজোয় যেটা পাওয়া যায়না সেটা হলো ছোটবেলাকার বন্ধুদের সাথে মণ্ডপে বসে আড্ডা, পরিবারের বাকি  সদস্যদের অনুপস্থিতিও অন্তরে কোথাও নাড়া দেয়। তাই  স্কাইপ, ফেসবুক আর ভাইবারই  মুস্কিল আসান। মন ভার করে লাভ নেই, মা আসছেন। পুজো ভালো কাটুক।






Wednesday, July 9, 2014

অরূপম মাইতি


ভালবাসা সবুজ ও সাহিত্য

২০১৪ বিশ্বকাপ এখন শেষ লগ্নে। কোয়ার্টার ফাইনাল সদ্য সমাপ্ত। সেমিফাইনাল লাইনআপ তৈরি। নতুন বিশ্বকাপ ফুটবল চ্যাম্পিয়ন দেশকে, আর কয়েক দিনের মধ্যে বিশ্ববাসী পেয়ে যাবে। সামনের মঙ্গল আর বুধবার সেমিফাইনাল। আগামী রবিবার খেলা শেষের পরে সোনার বিশ্বকাপ হাতে নিয়ে চ্যাম্পিয়নের শিরোপা মাথায় স্টেডিয়াম প্রদক্ষিণ করবে বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন দল।

বিশতম বিশ্বকাপ শুরুর প্রথম দিন থেকে বেশ কয়েকটি দেশ তাদের দীর্ঘ দিনের ফুটবল ঐতিহ্য, বিশ্ব ফুটবলে তাদের এযাবৎ কালের কৃতিত্ব এবং প্রবাদপ্রতিম ফুটবলারদের জন্য বিশ্বমানসে সমাদৃত। মাসাধিক কাল ধরে চলতে থাকা বিশ্বকাপ ফুটবলে, সারা পৃথিবীর মানুষ বুঝি ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি-কে চেনার চেষ্টা করেছে পেলে, মারাদোনা, রুমেনিগে, প্লাতিনি, পাওলো রোসিকে স্মরণ করে। ঠিক এই সময়ে একটা কথা মনে আসে।

শুধু গ্যারিঞ্চা-কাকা-রোনাল্দিনহো দিয়ে কেন বিশ্ব ব্রাজিলকে চিনবে? ব্রাজিলকে তো মানুষ পাওলো কোহেলোর দেশ বলেও জানে। আর্জেন্টিনা মানে কি শুধুই কেম্পেস-বাতিস্তুতা-রিকেলমে, আর্জেন্টিনা কি জর্জ লুই বর্গেসের দেশ নয়? বিশ্বের কাছে ফ্রান্সের পরিচয় কি শুধুই জিদান-রিবেইরি-বেঞ্জিমা। ফ্রান্স বলতে কি ভলতেয়ার, আলেক্সান্ডার ডুমা, ভিক্টর হুগো, শার্ল বোদলেয়ার বা আলবেয়ার কামু নয়?  ইতালি দেশে কি শুধু ডিনো জফ, রবার্টো ভাজ্জিও বা ফাবিও কানাভারো জন্ম নিয়েছে?  লুইগি পিরানদেলো(নোবেল প্রাইজ ১৯৩৪), সালভাতোর কোয়াশিমোদো (নোবেল প্রাইজ, ১৯৫৯)বা ডারিও ফো-এর (নোবেল প্রাইজ ১৯৯৭) মত বিশ্ববরেণ্য লেখকও তো ইতালি দেশটাতে জন্ম নিয়েছিলেন।

সাউথ আমেরিকার কয়েকটি দেশ এবারের বিশ্বকাপে উচ্চ পর্যায়ের ফুটবল শৈলী প্রদর্শন করেছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য যেমন চিলি গ্রুপ লিগ থেকে পরের রাউন্ড, প্রি কোয়ার্টার-ফাইনালে পৌঁছেছিল। কলম্বিয়া কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে ব্রাজিলের কাছে হেরে বিশ্ব কাপ থেকে ছিটকে গেলেও জেমস রডরিগেজ, ছয়টি গোল করে ২০১৪ বিশ্বকাপ ফুটবলে সোনার বুটের সবথেকে জোরালো দাবিদার।

দেশের নাম চিলি। চিলির ফুটবল মানে অ্যালেক্সি স্যানচেজ, ভিদাল, ভার্গাস। অত্যন্ত প্রতিভাসম্পন্ন গোলকিপার ক্লদিও
ব্রাভোকেও কি বাদ দেওয়া যায়। চিলি এমন একটি দেশ, যে দেশের নাম উচ্চারণ করলে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে পাবলো নেরুদা এবং গ্যাব্রিয়েল মিস্ত্রালের কথা। দুজনেই নোবেল পেয়েছিলেন। সেই পাবলো নেরুদা, বিশ্বকবির লেখায় যাঁর কবিতা প্রভূত সম্পৃক্ত হয়ে উঠেছিল। একটু বিশদে আলোচনা করা যাক। 

১৯১২ সাল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে গীতাঞ্জলির অনুবাদ করলেন। ভূমিকা লিখে দিলেন ডব্লিউ বি ইয়েটস। বিশ্বকবির সাহিত্যকীর্তি ফরাসি ভাষায় অনুবাদ করলেন আন্দ্রে গিদে। পাশাপাশি রাশিয়ান ভাষায় অনুবাদ করলেন বরিস পাস্তারনাক ও আনে আখমাতোভা। জন্মসূত্রে আমেরিকান ভাবী স্ত্রী জেনোবিয়া কাম্প্রুবির সহায়তায়, ১৯৫৬ সালে সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ বিজেতা বিশিষ্ট স্প্যানিশ কবি জুয়ান রামন জিমিনেজ পরের পাঁচ বছরে বিশ্বকবির বাইশটি গ্রন্থ স্প্যানিশ ভাষায় অনুবাদ করলেন। স্প্যানিশ এবং লাতিন আমেরিকান সাহিত্য সেই সময়ে রবীন্দ্রসাহিত্য দ্বারা প্রভূত প্রভাবিত হয়। উল্লেখযোগ্য রূপে এই প্রভাব লক্ষ্য করা গিয়েছিল বিখ্যাত মেক্সিকান কবি অক্টাভিও পাজ, পাবলো নেরুদা এবং গ্যাব্রিয়েল মিস্ত্রালের লেখায়।

তবে এই সব সাহিত্যিকের মধ্যে প্রবাদপ্রতিম চিলিয়ান কবি পাবলো নেরুদার মধ্যে রবীন্দ্রপ্রভাব বিস্তৃত হয়েছিল, সব থেকে বেশি। ‘বাইশটি প্রেমের কবিতা এবং একটি হতাশার গান’ নামে নেরুদার একটি গ্রন্থ কবিকে খ্যাতির চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে দেয়। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে বইটির বিক্রি ছাড়িয়ে যায় দশ লক্ষাধিক কপি। তবে বইটির সঙ্গে বিতর্কও জড়িয়ে ছিল। আর সেখানেও উপস্থিত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ভালোদিয়া তেইতিলবোয়েম নামে এক চিলিয়ান কবি আবিষ্কার করেন, কাব্যগ্রন্থের ১৬তম কবিতাটি বিশ্বকবির একটি কাব্যগ্রন্থের ৩০তম কবিতার হুবহু নকল। এই সাহিত্যচৌর্যের জন্য নেরুদাকে প্রচুর সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। বন্ধু জোয়াকিন সিফুয়েন্টেস সেপভেদা বারণ করা সত্বেও পাবলো এ কাজ থেকে বিরত থাকতে পারেননি। পরবর্তীকালে নিজের স্মৃতিকথায় নেরুদা এই অভিযোগ স্বীকার করে নিয়েছিলেন।

কলম্বিয়া দেশটির নাম শুনলে ফুটবল অনুরাগীদের মনে পড়বে কার্লোস ভালদোরামা, রাদামেল ফালকাও, রেনে হিগুইতা বা আন্দ্রে এসকোবারকে। একই সঙ্গে সাহিত্যানুরাগীদের মনে পড়বে ইভেলিও রোজারো, ল্যরা রেস্ত্রেপো, জুয়ান গ্যাব্রিয়েল বা জর্জ আইজ্যাকসের কথা। তবে সব থেকে বেশি মনে পড়বে বুঝি গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কোয়েজের কথা। ১৯৮২ সালে সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ বিজেতা এই প্রবাদপ্রতিম সাহিত্যিক মাত্র কিছু দিন আগে, গত ১৭ই এপ্রিল ২০১৪ তারিখে ইহলোক ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। কলম্বিয়ার রাষ্ট্রপতি তাঁর মৃত্যুকে এক মহানতম কলম্বিয়ানের মৃত্যু বলে অভিহিত করেন। ম্যাজিক রিয়্যালিজম সমৃদ্ধ তাঁর উপন্যাস ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ারস অফ সলিচিউড’ লাতিন আমেরিকান সাহিত্যে একটা জোয়ার নিয়ে এসেছিল। ২০০৪ সালে প্রকাশিত তাঁর অসামান্য উপন্যাস ‘মেমোরিজ অফ মাই মেলাঙ্কোলি হোরস’-এর রেশ সাহিত্যুানারাগীরা এখনও ভুলতে পেরেছেন কিনা, সন্দেহ আছে।  

II২II
এ তো গেল দেশ, তার ফুটবল এবং তার সাহিত্য নিয়ে আলোচনা। বিশ্বসাহিত্যে এমন অনেক লেখক আছেন, সাহিত্যের বাইরে যারা ছিলেন একান্ত ফুটবলপ্রেমি। আলবেয়ার কামুর কথা ধরা যাক।  যিনি ছিলেন একাধারে পেশাদার ফুটবলার এবং সাহিত্যিক। সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৫৭ সালে নোবেল পুরস্কার বিজেকা। কৈশোরে কামু রেসিং অ্যালজেরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে গোলরক্ষক হিসেবে উত্তর আফ্রিকান চ্যাম্পিয়ন কাপে খেলেছিলেন। ফুটবলকে নিয়ে তার একটি জনপ্রিয় উক্তি— ‘আমি ফুটবলের কাছে ঋণী, কারণ নৈতিকতা ও বাধ্যবাধকতা বলতে আমি যা শিখেছি তা ফুটবলের কাছ থেকেই পাওয়া।’ সে সময় কামুর এই উক্তিটি বিভিন্ন টি-শার্ট ও ফুটবল পোস্টারে লেখা থাকতো।

জ্যঁ পল সার্ত্রে (১৯০৫-১৯৮০), অস্তিত্ববাদী এই ফরাসি দার্শনিক ও লেখক ছিলেন ফুটবলের একজন অনুগত সতীর্থ। তার রচিত ‘ক্রিটিক অব ডায়ালেক্টিক্যাল রিজন’ বইটিতে তিনি হ্যারি রেডনাপের কথার মন্তব্যে বলেছিলেন— ‘ফুটবলের মাঠে  বিপরীত পক্ষের উপস্থিতিতে সবকিছুই জটিল হয়ে যায়।’

স্যার আর্থার কোনান ডয়েল (১৮৫৯-১৯৩০), বিখ্যাত গোয়েন্দা কাহিনী ‘শার্লক হোমস’ এর লেখক। তিনিও ছিলেন
একজন দক্ষ ফুটবল খেলোয়াড়। সাউথ সিতে থাকাকালীন তিনি সিউডোনিম এসি স্মিথের তত্ত্বাবধানে পোর্টসমাউথ অ্যাসোসিয়েশন ফুটবল ক্লাবের গোলরক্ষক হিসেবে খেলতেন। এমনকি কোনান একজন প্রতিভাবান ক্রিকেটারও ছিলেন। তিনি মেলবোর্ন ক্রিকেট ক্লাবের পক্ষে প্রথম শ্রেণীর দশটি ক্রিকেট ম্যাচ খেলেন।

অ্যানথনি বার্জেস(১৯১৭-১৯৯৩), ‘ক্লকওয়ার্ক অরেঞ্জ’ বইয়ের লেখক। তিনিও ছিলেন ফুটবলের একজন ভক্ত। ফুটবলকে উদ্দেশ্য করে তিনি একটি উক্তি করেন— ‘সপ্তাহের পাঁচদিন কাজের জন্য, সপ্তম দিন প্রার্থনা করার জন্য, আর ষষ্ঠদিন শুধুমাত্র ফুটবলের জন্য।’ ফুটবলপ্রেমীর এই লেখকের রয়েছে ফুটবল খেলা নিয়ে নানা ধরনের রচনা।
নিক হর্নবি, ব্রিটিশ লেখক, একজন আদ্যন্ত ফুটবলপ্রেমী আর এই প্রেমের বশেই ফুটবল নিয়ে তিনি লেখেন ‘ফিভার পিচ’ বইটি। পরবর্তীকালে এই বইয়ের কাহিনী নিয়ে একটি সফল চলচ্চিত্র নির্মিত হয়।

রডি ডাওয়েল, আইরিশ লেখক। বিখ্যাত বই ‘দি কমিটমেন্ট’। ১৯৬৭ সালে লীগ কাপ ফাইনালে চেলসি যখন টমি ডোচার্টির তত্ত্বাবধানে ছিল তখন থেকেই তিনি চেলসি’র সাপোর্টার। রডি ডাওয়েল তার বন্ধুকে বলেছিলেন ‘আমি ফাইনাল খেলাটি আমার বাবার সঙ্গে দেখছিলাম, আমার বয়স তখন আট অথবা নয়। সেদিন চেলসির খেলা আমার মন কেড়ে নিল, আর তখন থেকে আমি চেলসিকে সাপোর্ট করা শুরু করলাম।’

‘১৯৮৪’ এবং ‘অ্যানিম্যাল ফার্ম-এর লেখক, প্রাবন্ধিক জর্জ অরওয়েল (১৯০৩-১৯৫০) ফুটবলকে বর্ণনা করেছেন ‘বিউটিফুল গেম’ হিসেবে। ‘দ্য স্পোর্টিং স্পিরিট’-এ তিনি জাতীয়তাবোধ এবং ফুটবলকে এক করে দেখান। তিনি লেখেন— ‘তুমি যদি তোমার অসুস্থ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বিরাট তহবিল জোগাড় করতে চাও, তাহলে তুমি তা সফলভাবেই করতে পারবে ইহুদী-আরব, জার্মান-চেক, ভারতীয়-ব্রিটিশ, রাশিয়া-পোলিশ, ইতালি-যুগোস্নাভিয়ার মধ্যে ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করে। প্রত্যেক খেলায় পাওয়া যাবে লক্ষাধিক দর্শক…ফুটবল ন্যায়ের জন্য তেমন কিছুই করতে পারে না।’

সালমান রুশদি নিজেকে টটেনহামের একনিষ্ঠ একজন ভক্ত হিসেবেই পরিচয় দেন। ১৯৯৯ সালে তিনি ‘দ্য পিপলস গেমস, দ্য অ্যাডুকেশন অব সকার ফ্যান’ শিরোনামে আট পৃষ্ঠার একটি প্রবন্ধ লেখেন বিখ্যাত ‘নিউ ইয়র্কার’ পত্রিকায়।
জুলিয়ান বার্নস, ২০১১ সালের ম্যান বুকার পুরস্কার বিজয়ী এই লেখক আজীবন লেইস্টার সিটি ফুটবল দলের ভক্ত ছিলেন। ২০০১ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন— ‘লেস্টারশেয়ার হল আমার শৈশব।’ ১৯৯৬ সালের স্টিভ ক্লারিজ ও ক্রিস্টাল প্যালেসের মধ্যে ম্যাচটি ছিল তার জন্য স্মরনীয়।

II৩II
২০০৮ ইউরোপিয়ান কাপের আগে জার্মান পত্রিকা স্পিগেলকে দেওয়া বিশ্ববন্দিত তুর্কীশ সাহিত্যিক অরহান পামুকের একটি সাক্ষাৎকার থেকে ফুটবল এবং সাহিত্যের মধ্যে তৈরি হওয়া অটুট ভালবাসার কিছু নমুনা পাওয়া যায়।

প্রশ্নঃ আপনি নিজে কি ফুটবল খেলতেন?
পামুক: কোন ক্লাবের হয়ে নয়, স্কুল ছুটির আগে পরে ইস্তাম্বুলের রাস্তায় ফুটবল খেলেছি।

প্রশ্ন: আপনি কি ভালো খেলতেন?
পামুক: এ প্রশ্নে আমি বেশি বিনয়ী হতে চাই না। খেলায় আমার মেধা ছিল, কিন্তু আমি কখনই পেশিবহুল মানুষ ছিলাম না। খেলার থেকে বেশি খেলা নিয়ে কল্পনার ফানুস ওড়ানো আমার কাছে ছিল বেশি প্রিয়। ছোটবেলার এসব ফ্যান্টাসি মানুষের জীবনের ধরণটা ঠিক করে দেয়। সেসব ফ্যান্টাসিতে আমি ছিলাম একজন ফুটবল হিরো। আমার দিবাস্বপ্নের মধ্যে একটি দৃশ্যের কথা বলি। ইউরোপিয়ান কাপে আমাদের ফেনেরবাচে ক্লাব খেলছে আর আমার মতো একটা শিশুকে ৮৯তম মিনিটে মাঠে নামানো হয়েছে। আর যে একমাত্র গোলে আমাদের ক্লাব জিতেছে, সেটা আমিই দিয়েছি।

প্রশ্ন: আপনার সাহিত্যকর্মে ফুটবল নিয়ে কিছু লেখার কথা ভাবছেন?
পামুক: আমার লেখার মধ্যে যদি তুরস্ক হেরে যায় তাহলে সেটা সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে। প্রাচীন আমলে গ্রিকরা যেভাবে মঞ্চ-নাটক দেখত, ঠিক সেরকম স্টেডিয়াম হচ্ছে একটি মঞ্চ, যেখানে ফুটবলের নাটক প্রদর্শিত হয়। ফুটবল দেখার বিষয় আর সাহিত্য বলার।

তাছাড়া সাংবাদিকের চোখ দিয়ে দেখাটা আমার পছন্দের নয়, যেমন ফুটবলে মাফিয়াদের সম্পৃক্ততা। এ ধরনের বিষয় আমার ভালো লাগে না। আমার পছন্দের রূপকথার গল্পে ফুটবল কতটা দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, তা আমার জানতে ইচ্ছে করে না। ১৯৯০-এ প্রকাশিত আমার উপন্যাস 'দ্য বস্ন্যাক বুক'-এ এই বিষয়ে একটি ভূমিকা থাকার কথা ছিল। গল্পের একটি চরিত্র তার স্ত্রীর খোঁজে ইস্তাম্বুল চষে বেড়াচ্ছে। আমার উপন্যাসের প্রথম খসড়ায় লোকটি রেডিওতে শুনছে, তুরস্ক ফুটবলে ইংল্যান্ডের কাছে মার খাচ্ছে। একটার পর একটা গোল খেয়ে চলেছে। আশির দশকে তুরস্ক নিজের মাঠে বাছাই পর্বের দুটি খেলায় ইংল্যান্ডের কাছে ৮-০ গোলে হেরেছে। ইংরেজ খেলোয়াড়রা মাঠে আমাদের খেলোয়াড়দের টিটকারি দিয়েছে। সে দেশের পত্রিকায় আমাদের নিয়ে ঠাট্টা করা হচ্ছে এই বলে যে, এরকম একটি ম্যাচ খেলার মতো সত্যিকারের সবুজ মাঠ ইস্তাম্বুলে নেই। আমার কাছে এই পরাজয় দেশের সামগ্রিক অবস্থার একটি অপমানজনক আলঙ্কারিক বিবরণ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি এই অংশগুলো উপন্যাস থেকে বাদ দিয়েছি। এখন অনুতাপ হচ্ছে।

অরহান পামুক দেখিয়েছেন, ফুটবলে পরাজয় থেকে জাতীয়তাবাদ জাগ্রত হয়। ক্রমশ তা উগ্র জাতীয়তাবাদের রূপ নেয়। পরিবর্তে অন্য জাতিকে হেয় চোখে দেখতে থাকে।



ফুটবল এবং সাহিত্যের মধ্যে এই প্রেমের সম্পর্ক আগামী দিনে, আশা করা যায় আরও দৃঢ় হবে। কারণ, ফুটবলে যে সৃষ্টিশীলতা আর শৈল্পিক রূপকল্প আছে, তা কোন অংশে সাহিত্যের থেকে কম নয়। একটি সাধারণ মানুষ থেকে তারকা ফুটবলার হয়ে ওঠার কাহিনী কোন অংশে একটি আলোড়নসৃষ্টিকারী উপন্যাসের থেকে কম নয়। একটা দেশকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন গড়ে তোলার কাহিনী কোন অংশে একটি মহাকাব্যের থেকে কম নয়। ফুটবল মানুষকে সব দেয়। তার গরিমা, তার দর্প, তার অহংকার, নীতি, জাতীয়তাবোধ, নেতৃত্ব, শোষনের বিরুদ্ধে রুখে ওঠা সব, সব কিছু। এখানেই তো ফুটবল সাহিত্যের পরিপূরক।




ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়


   দিন বদলের পালা


প্রথমে বেড়ানো ছিল রেলগাড়ি করে । কুঝিকঝিক করতে করতে বিশাল ট্রেনকে টেনে নিয়ে যেত স্টিম ইঞ্জিন । তারপর এল ইলেকট্রিক ট্রেন ।  ডিজেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা দিয়ে ট্রেন  যা  আমরা এখনো চড়ছি । তবে স্থান কাল পাত্রভেদে ট্রেনের জার্নি বড্ড আরামদায়ক হয়ে ওঠে যখন রিজার্ভড আসন থাকে এবং ট্রেনটি পরিচ্ছন্ন থাকে । আশপাশের অনবরত বদলে যাওয়া দৃশ্যপট এই যাত্রার আনন্দকে আরো বাড়িয়ে তোলে ।  সেই সবুজ ধানক্ষেত বা গ্রামের চালাঘর কিম্বা দূরের সেই তালদীঘি কেমন যেন নস্ট্যালজিক করে তোলে । এখন সময়ের অভাবে ট্রেনে না গিয়ে হয়ত প্লেনে যেতে হয় আমাদের কিন্তু যে যাই বলুক ট্রেনে চলার সাথে সাথে কেমন যেন গ্রাম্যগন্ধ ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে থাকে আর ষ্টেশন এলেই সেই চা'ওয়ালার ডাক কিম্বা নিষিদ্ধ সব ডিপফ্রায়েডের হাতছানি ?  এখন চা ওয়ালার সফিষ্টিকেশন লেভেল অনেক ওপরে । ফোটানো চায়ের পরিবর্তে টিব্যাগ এসেছে । জনগণের কল্যাণার্থে, চা-কফির পাশে জায়গা করে নিয়েছে ঠাণ্ডা পানীয়ের বোতল ও খনিজলবণ সমৃদ্ধ পানীয় জল । মনে মনে ভালোলেগেও যায় এই সব দেখেশুনে । নিজের দেশটাকে কে না ভালো দেখতে চায় ! আমাদের ঠাকুমা দিদিমারা রেলগাড়িতে চড়ে হাওয়া পরিবর্তনের যেতেন, দেওঘর কিম্বা জসিডি, ঘাটশিলা কিম্বা দার্জিলিংয়ে। সাথে যেত ইকমিক কুকার। দেদার রান্নাবাটিও চলত রেলগাড়িতে। ম্যারিনেটেড মাংস, ডাল, চাল সব স্তরে স্তরে সাজিয়ে দিয়ে ইকমিক কুকারে বন্দী করে তারা তাসের আড্ডায় মেতে উঠতেন ট্রেন ছাড়ার পর। আমাদের প্রজন্মে লুচি-তরকারী-মিষ্টি বাড়ি থেকে বানিয়ে নিয়ে ট্রেনে ওঠা হত। আর এখন স্টুডেন্টরা মহা খুশিতে ইন্সট্যান্ট কাপ-ও-নুডলসে কিম্বা ডিহাইড্রেটেড বিরিয়ানির প্যাকেট খুলে দিব্যি গরম জল ঢেলে খেতে অভ্যস্ত । আরো ব্যস্ততা বাড়ছে। জীবন হয়ে উঠছে শর্টকাট। তারা কিচেনের তেলকালিকে বাইপাস করে জয় মা বলে ভাসায় তরী।  

প্লেনে কেমন যেন একটু বেশি শহর-শহর গন্ধ ।  চেনা শহরটা হুস করে পেরিয়ে যাবার আগেই একফালি বিকিনি জানলায় চোখ রেখে একচিলতে নীল নদীটাকে সি অফ করে চলা । শহরের আলুলায়িত নীলচে সবুজ নিকেল সালফেটের মত ল্যান্ডস্কেপটাকে টপকে টপকে মেঘের মধ্যে দিয়ে ভাসতে ভাসতে মনে হত এই যে নীচের শহরটাকে দেখছি সেখানে কোথাও একটা বিন্দুর মত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আমার বাড়ি  । ভাবতে ভাবতেই নিমেষের মধ্যে হারিয়ে যেত আমার শহর, নীল নদী, সবুজ গড়ের মাঠ,  সবুজ ঘেরা লেকের জল । মেঘের বাড়ির জানলা একে একে বন্ধ হয়ে যেত । পাইলট প্লেন ঘুরিয়ে দিত গন্তব্যের নিশানায় ।  আরবান ল্যান্ডস্কেপ, ব্যস্ত জীবনযাত্রা আমার চোখের আড়ালে তখন ।  প্রথম প্রথম প্লেনে উঠে মনে হ'ত সত্যি সত্যি এটা  আমার শহর ছিল তো ! এছিল শেষ আশির দশকের ভাবনা ।

তারপর হাইরাইজ, শপিং মল আরো ঝকঝকে সবুজ ল্যান্ডস্কেপ, ম্যানিকিওর্ড টাউনশিপের সবুজ, তারমধ্যে একরত্তি সুইমিংপুলের নীল প্লেনের জানলায় ধরা দিল । এরোপ্লেনে উঠে  ককপিটে গিয়ে  পাইলটের কেরামতি দেখা হত ।   দক্ষিণদিকে যাবার সময় পাইলট আর কেবিন ক্রু'কে রিকোয়েস্ট করা হত বঙ্গোপসাগর এলেই জানান দিতে, যেন পুরীর মন্দিরকে ওপর থেকে একটা ঢিপ করে পেন্নাম করে নিতে পারি কিম্বা উত্তর দিকে গেলে বেনারসের কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরকে ।    তখন পাইলটের দুনিয়া, প্লেন চালানোর কেরামতি আর ঐ এক স্কয়ার ফুট জানলার মধ্যে দিয়ে নিজের দেশের খুঁটিনাটি ঐশ্বর্য্যটাকে তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করাটাই ছিল বিরাট আনন্দের ।  আর রোদঝলমলে দিনে হিমালয়ের মাথায় রূপোর ঝালর ? সেটা দেখলে মনে হ'ত প্লেনে চড়ার পয়সা উশুল । মনে মনে বিজ্ঞানকে ধন্যবাদ দিতাম ।

মুঠোফোনের দুনিয়াটা কেমন ধীরে ধীরে বদলে দিল জীবনকে ।
এল বেশ গোদামাপের  মুঠোফোন ।  তখন এয়ারপোর্ট পৌঁছে বাড়িতে সংবাদ দেওয়াটা ছিল আরো রোমাঞ্চকর ব্যাপার । তারপর প্লেন ছাড়ার ঠিক আগের মূহুর্তে সেলফোন অফ করার আগে আরেকবার ফোন করে  জানানো... এ কথাই শেষ কথা নয়তো!

তারপর সংক্ষিপ্ত বার্তাবিনিময় বা এসেমেস চালু হল । আরো সুবিধে হল । কম খরচে যোগাযোগ । মনে মনে বিজ্ঞানের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই ।

এবার রঙিন সেলফোন । স্লিম এন্ড ট্রিম ।  ক্যামেরাও আছে । ছবি তুলে এমএমএস  পাঠানো যায় । অপব্যবহারে বেশী কাটতি হলনা এই এমএমএস প্রযুক্তির । মনে মনে বিজ্ঞানকে কটাক্ষ করলাম ।   

হাতের তালুতে সেলফোনটি নিয়ে কেন জানি বারবার মনে পড়ে যায়,কোনো এক টেলিকম কোম্পানির একদশকের পুরনো সেই বিখ্যাত শ্লোগানটিকে.... "কর‌ লো দুনিয়া মুঠ্ঠি মে"

সত্যি তো এই মুঠোফোন পুরো দুনিয়াটাকে হাজির করেছে আজ আমাদের হাতের নাগালের মধ্যে । মোবাইলের জন্মলগ্নে তার আকৃতি ছিল বেশ বড়সড় । তারপর টেকনোলজির উন্নতির সাথে সাথে সেটিও স্লিম হতে শুরু করল ।

সেলফোন হল যন্ত্র । মোবাইল পরিষেবা তার যন্ত্রী । দুটিই উপচে পড়ছে কারিগরি কৌশলে । এ বলে আমায় দেখ তো ও বলে আমাকে । এই দুটি প্রযুক্তির মেলবন্ধনে গ্রাহক নানারকম সুযোগ সুবিধে পেয়ে থাকেন ।

গোড়ার দিকে সেলফোন পরিষেবার যে প্রযুক্তি ছিল সেটি ভয়েস বা কথা বহন করত । পরিষেবাটি1Gবা প্রথম জেনারেশান । সেই যুগের হ্যান্ডসেটের প্রযুক্তি কেবল একটি রঙ(মোনোক্রোম্যাটিক)অক্ষর এবং সংখ্যা(আলফা নিউমেরিক তথ্য)স্ক্রিনে দেখাত । এরপরে পরিষেবার প্রযুক্তি উন্নত হয়ে2Gবা দ্বিতীয় জেনারেশনে পৌঁছল । এই2Gপরিষেবা কথার সঙ্গে ডেটা বা তথ্য বহন করল । সমতুল্য ভাবে হ্যান্ডসেট প্রযুক্তি একরঙা স্ক্রিন এবং অক্ষর ও অঙ্কের যুগপৎ গণ্ডী পেরিয়ে কম্পিউটারের মতন গ্রাফিকাল আইকন ব্যবহার শুরু করল ।

কিন্তু যেহেতু পরিষেবা প্রযুক্তি তথ্য বহনে সক্ষম সেই কারণে কিছু নতুন সুযোগ সুবিধে পেল গ্রাহক । যেমন এসেমেস এবং সীমিতভাবে ইন্টারনেট ব্রাউসিং ।

এইভাবে আন্তর্জালের সাথে মোবাইল ফোনের গাঁটছড়া বাঁধা হল;মুঠোফোন হ্যান্ডসেট নির্মাতারা নতুন সুযোগ সুবিধে দেওয়া শুরু করল যেমন ব্রাউসিং এর সাথে সাথে ইমেল বা সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং । অসুবিধে হল একটাই । এই সব আকর্ষণীয় সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করতে গেলে যতটুকু তথ্য বিনিময় করতে হয় সেটি2Gপরিষেবা প্রযুক্তি সামাল দিতে পারল না । পরিষেবা প্রযুক্তি আরো একধাপ এগুলো ।

2Gগণ্ডী পেরিয়ে এইবার মাঠে নামল3Gবা তৃতীয় জেনারেশান মোবাইল পরিষেবা।3Gপরিষেবার বিশাল তথ্যবহনকারী ক্ষমতাকে উপযুক্ত কাজে লাগানোর জন্য হ্যান্ডসেট প্রযুক্তি উন্নত হল;আইফোন এবং এন্ড্রয়েড ভিত্তিক মুঠোফোন বাজারে ছেয়ে গেল । এই আইফোন বা এন্ড্রয়েড ভিত্তিক স্মার্টফোনগুলি আদতে এক একটি ন্যানো কম্পিউটার যা ল্যাপটপ বা ডেস্কটপের তুলনায় কোনো অংশে কম নয় ।

3Gবা2Gপরিষেবা ব্যবহার করে ইন্টারনেটের সমস্ত সুযোগ সুবিধে যেমন ফেসবুক,ইউটিউব,গুগল ম্যাপস,গুগল সার্চ,জি মেল,ট্যুইটার ও অসম্ভব মনোরঞ্জন কারক গেম গ্রাহকের হাতের মুঠোয় পৌঁছে গেল ।3Gতথ্যবহনকারী ক্ষমতার পরিষেবা থাকলে সুবিধা বেশী কিন্তু পুরনো2Gতেও কাজ চলতে লাগল । এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কম্পিউটারের দুটো অসুবিধে । তার ছোট স্ক্রিন আর ছোট কিবোর্ড ।

কিন্তু'কুছ খোয়া কুছ পায়া'। কিন্তু কেয়া পায়া?

যদি বলি"নখদর্পণ" ?কারণ কিবোর্ডের অভাবে এখন সমস্ত হ্যান্ড সেট নির্মাতারা অত্যাধুনিক টাচস্ক্রিন প্রযুক্তি এনে দিয়েছেন যার ফলে আঙুলের একটুকু ছোঁয়াতেই নদী-পাহাড়-সমুদ্র আমাদের নখদর্পণে ।

প্রাচীনকালে যে অলৌকিক বিদ্যার সাহায্য নিয়ে কোনো দূরের বস্তু বা ব্যক্তির প্রতিবিম্ব নিজের নখে প্রতিবিম্বিত করে দেখার গল্প শোনা যায় সেই কি এই প্রযুক্তি?

তুফানি আড্ডার ফাঁকে,সেদিনের তিথি নক্ষত্র নিয়ে তুমুল তর্ক বেঁধে গেলে,সন্দেহ নিরসনের কায়দায় এই মুঠোফোনটি পঞ্জিকার ভূমিকাও পালন করতে পারেল হিন্দু ক্যালেন্ডার এপ্লিকেশনটির কৃপায় ।

"ইউরেকা"বলে জিতে গিয়ে বলেও দিতে পারেন"হাতে পাঁজি মঙ্গলবার" !

বেড়াতে গিয়ে সমুদ্রের ধারে সূর্যোদয় দেখার কাঙাল আমি । কিন্তু ভোরের ঘুমও যে ছাড়েনা দুচোখকে । তাই গুগল সার্চ করে টাইম এন্ড ডেট ডট কম থেকে সানরাইজ@পুরী পেয়ে গেলাম আগের দিন রাতে । ঐ স্থানের সূর্যোদয়ের নির্ঘণ্ট জেনে রেখে ঘড়িতে এলার্ম । ফলে সমুদ্রের ধারে গিয়ে ঘুমচোখে সূর্যদেবের আরাধনা করতে হ'লনা । আমি গেলাম সময়মত । উনিও টুক করে উঠে আমাকে দেখা দিলেন । রঙ ছড়াতে শুরু করলেন আকাশের ভাঁজে ভাঁজে ।

মনে মনে বললাম"ভাগ্যি স্মার্টফোন ছিলি আমার হাতে"!!!

কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়, দিন আগত ঐ! 
ক্রমে খুলে যাচ্ছে  2G জট। 3G হাতের মুঠোয়। আর 4G ধরে ফেলেছে তাদের।  নেটওয়ার্কের মধ্যে আমরা ক্রমশঃ প্রবেশ করে যাচ্ছি। বদলে যাচ্ছে জীবন।